আজ বিশ্ব বাবা দিবস, বিশ্বব্যাপী পালিত হওয়া বিভিন্ন দিবসগুলোর মত এ দিবসটিও আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করছে এদেশর কেউ কেউ। বাবা সন্তানদের রাজকুমার-রাজকুমারীর মতো দেখে। রাজত্ব, সিংহাসন থাকুক আর নাই থাকুক বাবার রয়েছে রাজকীয় হৃদয়।
যার বাবা বেঁচে আছেন, তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান সন্তান। আব্বা, আব্বু, বাবা, এ তিনটি ডাকই আমাদের দেশে প্রচলিত। তবে এর বাইরে আব্বাজান, বাবাই, বাপ্পি, ড্যাডি, পিতা, পিতাজি নানা শব্দে পরিচিত তিনি। বাবা মানে আপনত্ব। বাবা মানে আদর-শাসন-বিশ্বস্ততা। বাবা মানে নির্ভরতা। বাবা নিখাদ আশ্রয়। বাবা মানে বেঁচে থাকা। বাবা মানে আস্থা। বাবা বটবৃক্ষ। উত্তপ্ত সূর্যের তলে সন্তানের শীতল ছায়া। বাবা মানে ভরসা। সম্মানের মুকুট।
সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ ঘরে ঘরে নানা আয়োজনে পালন হচ্ছে বাবা দিবস। বাবাকে শুভেচ্ছা জানাতে কার্ড, গিফট হিসেবে ফাদারস ডে মগ, টি-শার্ট ইত্যাদি তৈরি করে গিফট কর্নারগুলো। পাশাপাশি এ দিবসকে ঘিরে নাটক, টকশো ইত্যাদি টিভি অনুষ্ঠানের আয়োজিত হচ্ছে।
১৯০৯ সালের আগে ওয়াশিংটনে বাবা দিবস পালিত হতো না। তখন স্থানীয় গির্জায় সোনোরা স্মার্ট নামে এক নারী বাবা দিবস পালনের আবেদন জানিয়ে স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সোনোরা স্মার্টও নিজের বাবার জন্মদিনের দিন (৫ জুন) বাবা দিবস পালন করার অনুমতি চান। তবে হাতে সময় কম ছিল বলে ওই বছরের ১৯ জুন এ অঙ্গরাজ্যে প্রথম বাবা দিবস পালন করা হয়।
ভৌগলিক দূরত্ব, সামাজিক ও সংস্কৃতিক পার্থক্যের পাশাপশি রয়েছে আমাদের ভাষা, কৃষ্টি, আচার ও ধর্মীয় রীতিগত তফাত। রয়েছে পরিবার ব্যাবস্থা ও বৈবাহিক সম্পর্কগত ভিন্নতা। আমাদের সমাজে বাবার নামেই আমাদের পরিচয়। পাশ্চাত্বের সমাজগুলোতে সেটা দরকার হয়না। বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়াই সেখানে সন্তান জন্মানো খুবই সাধারণ বিষয়। অথচ আমরা একটি বৈধ ধর্মীয় বৈবাহিক পদ্ধতির মাধ্যমে বাবার ঔরষে মায়ের গর্ভ হয়ে পৃথিবীতে আসি। তাই সে বিষয়গুলোর নিকে খেয়াল রেখে পিতা-মাতার প্রতি আমাদের যত্নবান হওয়া অবশ্যক।
রাগ শাসন আর রাশভারী চেহারার আবডালে এই মানুষটির যে কোমল হৃদয় তা মাতৃহৃদয়ের চেয়ে কম নয়। ‘মা’ এর মতো ‘বাবা’ও ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ গভীরতা অতলান্ত-অসীম।
পবিত্র কুরআনে সূরা আহকাফের ১৪ নম্বর আয়াতে, বনী ইসরাইলের ২৪ নম্বর আয়াতে, সূরা নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে সূরা লোকমানের ১৪ আয়াতে পিতা-মাতার খেদমত করার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ পাক। সন্তানের জন্য পিতার দোয়া আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে কোন আড়াল থাকে না।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমার পালন কর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত কর না এবং বাবা-মার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন; তবে তাঁদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদের সঙ্গে বল শিষ্টাচারপূর্ণ কথা। (সূরা বনি ইসরাইল)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘পিতা-মাতা জান্নাতের মাঝের দরজা। যদি চাও, দরজাটি নষ্ট করে ফেলতে পারো, নতুবা তা রক্ষা করতে পারো। (তিরমিযী, তুহফাতুল আহওয়াযী, ৬/২৫)।
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তার নাক ধূলায় মলিন হোক (৩ বার), সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেই হতভাগ্য ব্যক্তিটি কে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহে ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, সে হলো ওই ব্যক্তি, যে তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেল অথচ তাদের সেবা করে জান্নাত হাসিল করতে পারলো না’ (মুসলিম-৪/১৯৭৮, হা-২৫৫১)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে নিহিত।’ (তিরমিযি-১৮৯৯)।
মুসলিমদের পাশাপাশি এখানে হিন্দু ধর্মের লোকেদের অবস্থান রয়েছে। তাদের ধর্মেও বলা আছে, ‘পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহী পরমং তপঃ, পিতরী প্রিতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতা’— হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই মন্ত্র জপে বাবাকে স্বর্গজ্ঞান করে শ্রদ্ধা করেন। সন্তানের আদর-শাসন আর বিশ্বস্ততার জায়গা হলো বাবা।
জনপ্রিয় শিল্পী নচিকেতার গাওয়া বিখ্যাত সে গান, ‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার/মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার-ওপার। নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামি দামি/সবচেয়ে কমদামি ছিলাম একমাত্র আমি। ছেলে আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম/আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম।’
নচিকেতার এই গানের বাস্তবতা বাবা দিবস অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনে পালন করা হচ্ছে বাবা দিবস। পিতার বুকফাটা আর্তনাদ না শোনার মতো সন্তানও এই সমাজে আছে আর সে সংখ্যা যেনো প্রতি নিয়ত বেড়েই চলছে।
বিশ্বায়নের এই সময়ে এসে বাংলাদেশে আমরা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক আয়োজনে সম্পৃক্ত হই। সেটা দোষের কিছু নয় তবে আমাদের উচিত সে আয়োজনে আমাদের নিজস্বতা বজায় রাখা। একথা স্পস্ট যে, বাবা, পিতা, জনক বিষয়টা আমাদের কাছে অনেক বেশি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও  আবেগ অনুভূতির বিষয়। তাই আধুনিকতার অনুকরণে যেনো আনুষ্ঠানিকতায় না হারায় সে আন্তরিকতা। প্রত্যেক সন্তানকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
লেখকঃ মোঃ রিমন মিয়াজী
সাধারন সম্পাদক – ১নং নায়েরগাঁও উঃ ইউনিয়ন ছাত্রলীগ। মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here