আট বছরের বেশি সময় ধরে কোনো নিবন্ধন ছাড়াই হাসপাতাল কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে গাজীপুরের সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। একই সঙ্গে নিবন্ধন ছাড়াই ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র পরিচালনা করে আসছিল প্রতিষ্ঠনটি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি এসব তথ্য পেয়েছে হাসপাতালটিতে অভিযান পরিচালনাকারী স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সমন্বিত টাস্কফোর্স।

১০ আগস্ট সোমবার দুপুরে সমন্বিত টাস্কফোর্স এর নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ বিপুল পরিমান রিয়েজেন্ট এবং সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট পাওয়া গেছে। এছাড়া হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোও মেয়াদোর্ত্তীর্ণ। এসব অনিয়ম ও অসঙ্গতির কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা জরিমানা করেছে টাস্কফোর্স। পাশপাশি আগামী ২৩ আগস্টের মধ্যে সব ধরনের নিবন্ধন করিয়ে নিতেও নির্দেশনা দেন অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা।

টাস্কফোর্সের অন্যতম সদস্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (হাসপাতাল) উম্মে সালমা তানজিয়া অভিযানে নেতৃত্ব দেন। এসময় র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম, গাজীপুর র‌্যাব-১ ক্যাম্পের কমান্ডার আবদুল্লাহ আল মামুন এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল শাখার কর্মকর্তা ডা. দেওয়ান মেহেদী হাসান অংশগ্রহণ করেন।

অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা জানান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মালিকানাধীন সিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে লাইসেন্স না থাকাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় অবস্থিত ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটির নেই সরকারি কোনো অনুমোদন। হাসপাতালটির অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোও মেয়াদোত্তীর্ণ।

অভিযানে বিপুল পরিমান মেয়াদোত্তীর্ণ রিয়েজেন্ট, সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ মেডিকেল কলেজের অনুমতি নিয়ে অবৈধভাবে প্রায় ৮ বছর ধরে ৫’শ শয্যার হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক ও রক্তপরিসঞ্চালন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে নিবন্ধনের জন্য কখনোই স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল শাখায় কোন আবেদন করা হয়নি। এমনকি হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ এবং রক্তপরিসঞ্চালন কার্যক্রম পরিচালিত হতো অনুমোদহীনভাবে।

অভিযান পরিচালনার সময় হাসপাতালে দু’জন রোগী ও কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী থাকলেও কর্তৃপক্ষের কাউকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে ফোন করে তাদের হাসপাতালে আনা হয়।

হাসপাতালটির করোনা ইউনিট চালুর অনুমতি না থাকেলেও সেখানে রয়েছে ১০০ শয্যার করোনা আইসোলেশন ইউনিট। পিসিআর ল্যাব না থাকলেও নিয়মিত করা হচ্ছে করোনা পরীক্ষা-এমন ধরনের অভিযোগ থাকলেও ট্রস্কফোর্সেল সদস্যরা তার কোন প্রমাণ পায়নি।

এই সময়ে পার্শ্ববর্তী সেবা হাসপাতালেও অভিযান পরিচালনা করে ট্রাস্কফোর্স। সেখানে গিয়েও পর্যাপ্ত পরিমাণ রিয়েজেন্ট ও সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট পাওয়া গেছে। এই হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন থাকলেও তাদের রক্তপরিসঞ্চালন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে অনিবন্ধিতভাবে। এসব কারণে এই হাসপাতালকেও সাড়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এর আগে গত ৮ জুলাই শনিবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আমাগী ২৩ আগস্টে মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স বা নিবন্ধন নবায়ন করার বাধ্যবাধকতা জানানো হয়। ওই সময়ে মধ্যে যারা নবায়নে ব্যর্থ হবে তাদের হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হবে বলেও জানানো হয়।

সভায় জানানো হয়, বর্তমানে নিবন্ধন ছাড়াই কার্যক্রম চলিয়ে যাচ্ছে ১১ হাজারের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়গনস্টিক।

ওই সভায় উপস্থিত থেকে ট্রস্কফোর্সের আহ্ববায়ক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (জনস্বাস্থ্য) বলেন, যত বড় হাসপাতালই হোক ২৩ আগস্টের পর কোনো ছাড়া পাবে না। এছাড়া এখন থেকে স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অভিযান পরিচালনা করবে। তারই ধারাবাহিকতায় টাস্কফোর্স এই অভিযান পরিচালনা করে।

গত ২৬ জুলাই কোভিড-১৯ বিষয়ক শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শিব্বির আহমেদ ওসমানী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে একথা জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ প্রতিরোধে ও আক্রান্ত রোগীরদের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা প্রদান নিশ্চিতকরণে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এ পর্যন্ত জারিকৃত পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন, আদেশ, নির্দেশনা ও যেসব কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদের কার্যক্রম বাস্তবায়ন অগ্রগতি তদারকি করতে একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (জনস্বাস্থ্য) আহ্বায়ক করে ৯ সদস্যের এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। অন্যান্য সদস্যরা হচ্ছেন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (প্রশাসন), স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (প্রশাসন), অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ( প্রশাসন, অর্থবিভাগ), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (প্রশাসন, জননিরাপত্তা বিভাগ), স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক, রোগতত্ত্বব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (জনস্বাস্থ্য-১)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here