বিশেষ সংবাদদাতাঃ

কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের চেকপোস্টে গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্কে চিড় ধরানোর অপচেষ্টা করেছিলেন স্বাধীনতা বিরোধী চিহ্নিত একটি চক্র।

এ হত্যাকান্ডকে ঘিরে দেশজুড়ে অস্থিতিশীল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টির দিবা স্বপ্নও তারা দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু চেনা সেই মহলটির হীন অপপ্রয়াস নসাৎ করে দিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও পুলিশ প্রধান ড.বেনজীর আহমেদ।

একই টেবিলে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই বাহিনী প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এ হত্যাকান্ডের তদন্তে গঠিত কমিটির ওপর নিজেদের পূর্ণ আস্থার কথা জানানোর পাশাপাশি বিষয়টিকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন।

একই সঙ্গে সেনা ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যকার পারস্পরিক আস্থা অটুট রাখারও ঘোষণা দেওয়ায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা ইস্যুতে উসকানি দেওয়া মহলটি রীতিমতো ফুটো বেলুনের মতোই চুপসে গেছে।

ফায়দা হাসিলে নতুন যড়যন্ত্রের পরিকল্পনাও অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়েছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বুধবার (০৫ আগষ্ট) দুপুরে কক্সবাজারের সেনাবাহিনীর বাংলো জলতরঙ্গে সেনা ও পুলিশ প্রধানের যৌথ সংবাদ সম্মেলনটিকে অনেকেই ‘বিরল’ সংবাদ সম্মেলন হিসেবেই অভিহিত করেছেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিদের হটিয়ে দিলেও পাশাপাশি বসে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রধানের এমন যৌথ সংবাদ সম্মেলনের নজির এবারই প্রথম।

সিনহা হত্যাকান্ডের ঘটনায় দায়ী হিসেবে যে বা যারা চিহ্নিত হবে, তাদেরই শাস্তি হবে এবং এর দায় বাহিনীর উপর পড়বে না, এদিনের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এমন মতও প্রকাশ করেন দুই বাহিনী প্রধান।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ নিহত হওয়ার পঞ্চম দিনের মাথায় বুধবার (০৫ আগষ্ট) দুপুরে কক্সবাজার আসেন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং আইজিপি ড.বেনজীর আহমেদ।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগেই তারা সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

স্থানীয় সেনাবাহিনীর বাংলো জলতরঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রথমেই কথা বলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

তিনি বলেন, ‘যে ঘটনাটা ঘটেছে, সেজন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মর্মাহত এবং পুলিশ বাহিনী মর্মাহত। যে ম্যাসেজটা আমরা দিতে চাই তা হচ্ছে- আমরা এটাকে একটা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসাবে দেখতে চাই। এ ধরণের ঘটনা যেন ভবিষ্যতে দ্বিতীয়টি না ঘটে সেটি নিশ্চিত করতে চাই।’

‘আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটা জিনিস আমরা নিশ্চিত করতে চাই, যে ঘটনাটা ঘটেছে ওই ঘটনার সঙ্গে যে যে সম্পৃক্ত থাকবে, ইনকোয়ারি টিম যাদেরকে চিহ্নিত করবে, তারাই সেই দোষের প্রায়শ্চিত্ত করবে, যোগ করেন সেনাপ্রধান।

জেনারেল আজিজ আহমেদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির ওপর দুই বাহিনীর পূর্ণ আস্থার কথা জানিয়ে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের মাকে ফোন করে সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। তার কথার ওপর সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর আস্থা আছে।’

তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ ও সেনাবাহিনী নিয়ে একটি জয়েন্ট ইনকোয়ারি টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। যারা গতকাল (মঙ্গলবার) থেকে কাজ শুরু করেছে।

এই তদন্ত দলের প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আস্থা আছে এবং পুলিশ বাহিনীরও আস্থা আছে। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই বাহিনীর সম্পর্কে চিড় ধরবে না।’

জেনারেল আজিজ আহমেদ আরও বলেন, ‘বিগত ৫০ বছরে দেশে যে উন্নতি অগ্রগতি এসেছে, দেশি-বিদেশি যেসব ঝুঁকিগুলো এসেছে আমরা সশস্ত্রবাহিনী এবং পুলিশ অন্যান্য সংস্থাগুলোর মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছি।

আমাদের মধ্যে যে মিউচুয়াল ট্রাস্ট, কনফিডেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন অনেক বছর ধরে তৈরি হয়েছে এটা অটুট থাকবে, এটাতে কোনো রকমের চিড় ধরে এমন কোনো কিছু সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও হবে না এবং পুলিশ বাহিনী বলেছে তাদের মধ্য থেকেও হবে না।’

সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহার ঘটনাকে হাতিয়ার করে কেউ যেন সেনা-পুলিশ সম্পর্ক নষ্ট করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকারও আহ্বান জানান সেনাপ্রধান।

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা নিয়ে সেনাবাহিনী এবং পুলিশের মধ্যে একটা অনাকাঙ্খিত কিংবা চিড় ধরানো বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করার কোনো প্রয়াস যাতে কেউ না চালায়, আমরা সেটা সবাইকে অনুরোধ করবো।

আমাদের সকলের চেষ্টা করা উচিৎ তদন্তটা যাতে নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু হয়। ঘটনা যেহেতু তদন্তাধীন আছে, আমরা সেটা নিয়ে অন্য কোনো কথা বলব না’ যোগ করেন জেনারেল আজিজ।

সেনাপ্রধানের বক্তব্যের পর সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড.বেনজীর আহমেদ, বিপিএম (বার)। বক্তব্যের শুরুতেই এ ঘটনায় সেনাপ্রধানের ছুটে আসার জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান।

সেনাপ্রধানের বক্তব্যের সঙ্গে কন্ঠ মিলিয়ে পুলিশের আইজি বলেন, ‘আমাদেরও একই কথা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশে পুলিশের গত ৫০ বছর ধরে একসাথে কাজ করার ইতিহাস রয়েছে।

গত ৫০ বছরে দেশের অনেক ক্রাইসিস মুহূর্তে এই দুটি বাহিনী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। আমাদের মধ্যে একটা পরস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং আস্থার সম্পর্ক রয়েছে। আমরাও এটাকে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে দেখি।’

ড.বেনজীর আহমেদ আরও বলেন, ‘অনেকে এই সুযোগে উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলছেন। আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত দক্ষ, চৌকস একটি ফোর্স। এই সমস্ত উস্কানি দিয়ে তারা কখনও সফল হতে পারবে না।

সেনাপ্রধান ও পুলিশ প্রধান নিজেদের বক্তব্যে এ ঘটনায় দুই বাহিনীর পারস্পরিক আস্থায় কোন ঘাটতি তৈরি হবে না বলেও আশ্বস্ত করেন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহার ঘটনাটি যেন দুই বাহিনীর মধ্যে শেষ ঘটনা হয়। এ ঘটনা যেন আর না ঘটে এ বিষয়টিই আমরা নিশ্চিত করতে চাই। এজন্য আমাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে।

সিনহা হত্যাকান্ডের তদন্তে শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভসহ আশপাশ এলাকায় সেনা ও পুলিশের যৌথ টহলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন সেনা ও পুলিশ প্রধান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভয়ভীতির উর্ধ্বে উঠেই তদন্তে স্বাক্ষী দেওয়ার পাশাপাশি দেশপ্রেমিক দু’টি বাহিনীর মাঝে আর কোন ভুল বুঝাবুঝির সুযোগ যেন না থাকে এবং আস্থা-বিশ্বাসের বন্ধন অটুট ও মজবুত থাকে সে লক্ষ্যেই ওইসব এলাকায় যৌথ টহলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

পরে সংবাদ সম্মেলন শেষে সেনা ও পুলিশ প্রধান মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে যান। এরপর তারা ঢাকায় ফিরে আসেন।

এদিকে, অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকান্ডে বুধবার (০৫ আগষ্ট) দুপুরে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার সাহা ও বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ পুলিশের ৯ সদস্যের বিরুদ্ধে স্থানীয় আদালতে মামলা দায়ের করেছেন নিহতের বোন শারমিন শাহরিয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here